Eid e-Milad-un Nabi লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Eid e-Milad-un Nabi লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৫

eid -e- milad-un nabi | যারা মিলাদুন্নবী উদ্যাপনকে অস্বীকার করে তাদের মুরুব্বীদের দৃষ্টিতে মিলাদুন্নবী (দঃ)

মুফতি মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল আলী কাদেরী

কামিল (হাদিস, ফিক্হ) বি.এ (অর্নাস)

যুগে যুগে কালে কালে প্রত্যেকেই ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন করেছেন তাদের অধীনে তাদের পরিবেশে তাদের মতো করে। ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন করেছেন ভিন্ন পরিভাষার মধ্য দিয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে। কেউ পালন করেছেন দরূদ শরীফ, কেউ পালন করেছেন মিলাদ শরীফ দিয়ে। আর সবগুলো অনুষ্ঠানই করেছেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগমনের মাস রবিউল আওয়ালে। করেছেন এক আর মুখে বলী আউরাচ্ছেন আরেক। আমরা নাকি মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমদানী করেছি। যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা। গোয়ালার দই গোয়ালার নিকট নাকি কখনো টক হয় না। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের দীক্ষা দিয়ে প্রত্যকের পাসাল্লাম ভারী করতে প্রত্যেকেই সচেষ্ট ও যতœবান। আমরা গড্ডলিকা প্রবাহ পরে শুধু সাফাই গিয়ে গেছি। আমাদের সাফাই না-ই শুনলে, এবার তাদের মুখে তাদের সাফাই গাওয়া শুনুন, ওহাবীদের গুরুঠাকুর, পীর মাশায়েখগণের পীর রহমাতুল্লাহ।
(১) হযরত হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ:) কী বলেন-
مشرب فقير كا يہ ہے- كہ محفل مولد ميں شريک ہوتا ہون بلكہ ذريعاۓ بركات سمجہ كر ہرسال منعقد كرتا ہون اور قيام ميں لطف ولذت پاتاہوں-
অর্থ : এ ফকিরের নিয়ম হল- আমি মিলাদ মাহফিলে অংশ গ্রহণ করে থাকি বরং মিলাদ অনুষ্ঠানকে বরকত লাভের অছিলা মনে করে প্রত্যেক বৎসরই মিলাদের মজলিস করে থাকি এবং অনুষ্ঠানে কিয়ামের সময় অশেষ আনন্দ ও আরাম উপভোগ করি। (হাফতে মাসয়ালা-১৫ পৃষ্ঠা)
(২) মৌলভী রশীদ আহমদ গাঙ্গুহীর উস্তাদ শাহ আহমদ সাঈদ হানাফী (রাহঃ) তার ‘মালফুজাত’এ বলেছেন-“মিলাদ শরীফ পাঠ করা এবং জন্মবৃক্তান্ত আলোচনা কালে দাঁড়িয়ে (ক্বিয়াম) যাওয়া মুস্তাহাব (মিলাদ ও ক্বিয়ামের ফতোয়া, পৃঃ৭৯, মাকামাতে সাঈদীয়া ওয়া মাকামাতে আহমাদীয়া পৃ-১২৮)।
(৩) দেওবন্দীদের অন্যতম বুযুর্গ মৌলভী আশরাফ আলী থানভী বর্ণনা করেন-হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নূর মোবারকের উছিলায় সমস্ত জগৎ সৃজন হয়েছে (মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , পৃ-১৯২, কৃত;আশ্রাফ আলী থানভী)।
(৪) মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী দেওবন্দীর দৃষ্টিতে মিলাদ ও কি¦য়াম মুস্তাহাব (মাকতুবাতে শাইখুল ইসলাম, ১ম খন্ড, পৃ-৩৩৯)।
(৫) দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা হাজী সৈয়্যদ আবেদ হুসাইন হানাফী, তিনি প্রত্যেক শুক্রবার মাগরীবের পর মিলাদ শরীফের আয়োজন করতেন। হাজী সাহেবের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ঐ মিলাদ ও ক্বিয়ামের অনুষ্ঠান জারী ছিল (মিলাদ ও কিয়ামের ফতোয়া, পৃ-৮৬)।
(৬) এ প্রসঙ্গে মক্কা শরীফের তৎকালীন মুফতী এনায়েত আহমদ রহমাতুল¬াহি আলাইহি তার প্রসিদ্ধ তাওয়ারিখে হাবীবে ইলাহ গ্রন্থেও ১২ নং পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেন-
اور بهى علماءے لكها ہے كہ اس محفل ميں ذكر وفات شريف كا نہ چاہے اس لئے كہ يہ محفل واسطے خوشى ميلاد شريف كے منعقد ہوتى ہے ذكر غم جانكاه اس ميں محض نازيبا ہے – حرمين شريف ميں ہرگز اجازت ذكر قصة وفات كى نہیں ہے -
অর্থাৎ-আলেম সমাজ এ কথাই লিখিয়াছেন যে, এই মাহফিলে রাসূলের ওফাত শরীফ বা ইন্তেকালের আলোচনা করা ঠিক নয়, এ জন্য যে এ রবিউল আউয়াল মাসে অনুষ্ঠিত মাহফিল মীলাদুন্নবী সাল¬াল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল¬াম এর খুশি উদযাপন করার জন্য অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে মক্কা মদীনা শরীফে রাসূল সাল¬াল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল¬াম এর ওফাত শরীফের আলোচনা করার অনুমতি কখনোই ছিল না।
(৭) ইবনে তাইমিয়া বলেন- (লামাযহাবী)
وَكَذَلِكَ مَايُحْدِثُهُ بَعْضَ النَّاسِ اِمَّا مُضَاهَاةُ لِلْنَصَارَى فِىْ مِيْلَادَ عِيْسَى عَلَيْهِ السَّلَامِ وَاِمَّا مُحَبَّةِ لِلِنَّبِى صَلَّى اَللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَتَعْظِيْمًا وَاَللهُ قَد ْيُثيْبُهُمْ عَلَى هَذِهِ الْمُحَبَّةِ وَاَلْاِجْتِهَادِ-
অর্থ : এভাবে কিছু লোক মিলাদ মাহফিলের অনুষ্ঠান করে থাকে। এটার উদ্দেশ্য হয়ত খৃষ্টানদের সাথে সাদৃশ্য। (তারা হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর জন্ম দিন পালন করে) অথবা তাদের উদ্দেশ্য কেবল হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি মুহাব্বত ও সম্মান প্রদর্শন করা। যদি দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হয়, তাহলে আল্লাহ এ ধরনের মুহাব্বত ও প্রচেষ্টামূলক কার্যকলাপে সওয়াব দিবেন। (একতেদাউ সিরাতেল মুস্তাকিম পৃষ্ঠা ২৯৪)
ذكر ابن تيمية في كتابه "اقتضاء الصراط المستقيم في مخالفة أصحاب الجحيم" (২/৬৩৪-৬৩৫)
(৮) সিফায়ে সায়েল গ্রন্থে শাহ আব্দুল গণি দেহলভী সাহেব লেখেছে –
وحق انست كہ نفسى ذكر ولادت انحصرت صلى الله عليہ وسلم وسرور و فاتحة نمودن يعنى ايصال ثوب فتوح سيد الثقلين ازكمال سعادت انسان است-
অর্থ : সত্য কথা হল, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘র মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন করা ফাতিহা পড়ে তাঁর মহান রুহে সওয়াব রেসানী এবং তাঁর মিলাদ শরীফে আনন্দ করার মধ্যেই রয়েছে মানুষের পূর্ণাঙ্গ সৌভাগ্য। (সেফায়ে সায়েল ১৪পৃঃ)
(৯) ফতুয়ায়ে এমদাদিয়ায় উল্লেখ আছে -
والاحتفال بذكر الولادة ان كان خاليا عن البدعات المروجة جائز بل مندوب كسائر اذكاره صلى الله عليه وسلم والقيام عند ذكر ولاته ولادته الشريفه حاشا الله ان يكون كفرا-
অর্থ : রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘র বেলাদত শরীফের বর্ণনা করবার জন্যে মাহফিল করা মুস্তাহাব, যখন তা (হিন্দুস্থানে প্রচলিত) ধ্বংসাতœক বিদআত সমূহ হতে পবিত্র হয় এবং তাঁর বেলাদতের বর্ণনা দিতে গিয়ে কিয়াম করা কখনও কুফরী নয়। (ফতুয়ায়ে এমদাদিয়া ৫/২৬৪ পৃষ্ঠা)
কথিত আছে, ফতুয়ায়ে এমদাদিয়ায়, তাদের ভাষায়, “স্বাক্ষর করেছেন শায়খুল হিন্দ মাহমুুদুল হাসান, শায়খুল হাদিস আনোয়ার শাহ কাস্মিরী সহ প্রখ্যাত আলেমগণ।”
১০। আশ্রাফ আলী থানবী ( ওহাবীদের নেতা) ‘তরিকায়ে মিলাদ’ কিতাবের ৮ পৃষ্ঠায় লেখেন : এ সমস্ত ব্যাখ্যাবলি (অর্থাৎ শিরনী, কিয়াম ইত্যাদি) প্রকৃত পক্ষে মুবাহ কাজসমূহের অন্তর্ভুক্ত। এতে কোন অনিষ্ট নেই এবং সেই জন্য প্রকৃত মিলাদ অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কোন প্রকার নিষেধ আসতে পারে না। কিন্তু যখন এ সমস্ত মুবাহ পালনের ফলে কোন ফাসাদ এবং অনিষ্ট ঘটাইয়া থাকে তখন সাময়িকভাবে এ সমস্ত কাজ (অর্থাৎ শিরনী, কিয়াম ইত্যাদি) এবং ঐ মাহফিল নাজায়েজ ও নিষিদ্ধ বলা যাবে এবং যেখানে ঐ সমস্ত কাজের সম্ভাবনা নেই তাতে কোন নিষেধ আসতে পারে না।
টীকা : উল্লিখিত মনীষীদের উক্তিতে দেখতে পাওয়া যায়, মিলাদ, মিলাদ শরীফ, দরূদ শরীফ, কিয়াম, মিলাদুন্নবী ইত্যাদি। কিন্তু লক্ষ্যবস্তু সকলেরই এক ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা। তাই একেকজন একেক পরিভাষায় তা প্রকাশ করেছেন।

মুফতি মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল আলী কাদেরী
কামিল (হাদিস, ফিক্হ) বি.এ (অর্নাস)
সহ -সুপার, কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা (মহিলা শাখা)
মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

eid -e- milad-un nabi | কুরআন ও হাদীসের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (১ম পর্ব)

মুফতি মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল আলী কাদেরী

কামিল (হাদিস, ফিক্হ) বি.এ (অর্নাস)

সহ -সুপার, কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা (মহিলা শাখা)

মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭


بسْمِ اللهِ الرََّحْمَنِ الرَحِيْم
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা’য়ালার জন্য যিনি প্রিয় হাবীবের ‘মিলাদ’ তথা শুভাগমনের মাধ্যমে নবুয়তের দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। অসংখ্য দুরূদ ও সালাম সেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাসাল্লামমের উপর যার পবিত্র মিলাদ এর বার্তাবাহক ছিলেন হযরত বাবা আদম আলাইহিস সালাম থেকে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম পর্যন্ত সকল নবী-রাসূল।
মানবতার কান্ডারী, মুক্তির দিশারী রাহমাতুল্লিল আলামীন হযরত আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১২ই রবিউল আওয়াল ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে সোমবার সোবহে সাদিকের সময় দুনিয়ায় শুভ আগমন করেন।
সত্যের মাপকাঠি সাহাবায়ে কেরাম থেকে বিশুদ্ধরূপে বর্ণিত হয়েছে যে, ১২ই রবিউল আওয়াল শরীফ প্রিয় নবী হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম Ñএর পবিত্র শুভ আগমনের দিন। যেমন, হাফেজ আবূ বকর ইবনে আবী শায়বাহ্ (ওফাত ২৩৫ হিজরী) সহীহ সনদ সহকারে বর্ণনা করেছেন,
عن جابر وابن عباس انهما قالا ولد رسول الله عليه وسلم عام الفيل يوم الاثنين الثانى عشر من شهر ربيع الاول-
অর্থঃ হযরত জাবের ও হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বীয়াল্লাহু আনহুম বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম Ñএর বেলাদত শরীফ ঐতিহাসিক ‘হস্তি বাহিনী বর্ষের’ (যে বছর আবরাহা তার হস্তিবাহিনী নিয়ে কা’বা শরীফ ধ্বংস করতে এসে নিজে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছিল) ১২ই রবিউল আওয়াল সোমবার হয়েছিললুগুল আমান ফী শরহি ফাতহির রব্বানী, খন্ড ২, পৃষ্ঠা-১৮৯, বৈরুত; আল বেদায়া ওয়ান নিহায়া, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৮৯, বৈরুত]
যুগে যুগে সারা বিশ্বের ঈমানদার মুসলমানগণ শরীয়ত সম্মত উপায়ে মিলাদুন্নবী দিবসে জশ্নে জুলূস ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন করে আসছে। এই জুলূস ঈমানদারদের ঈমানী খোরাক। শরীয়তের আলোকে এর দলিল ও ফজিলত আলোকপাত করা হলো।


জশ্নে জুলূস অর্থ ঃ
আরবীতে ‘জশন’ শব্দের অর্থ খুশি বা আনন্দ (লুগাতে কিশওয়ারী) ‘জুলূস’ শব্দটি ‘জলসা’ শব্দের বহুবচন এর অর্থ হলো বসা বা উপবেশন। আর ফার্সিতেÑ ‘জশন’ শব্দের অর্থ উৎসব, রাজকীয় অনুষ্ঠান এবং ‘জুলূস’ শব্দের অর্থ হল আড়ম্বর, মিছিল করা। (ফরহাঙ্গ-ই-রব্বানী)।

ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্থ ঃ
প্রচলিত অর্থে ঈদ মানে খুশি। মিলাদ (ميلاد) অর্থ জন্মকাল বা জন্মের সময়। মাওলিদ (مولد) শব্দটিও অভিন্ন অর্থ বুঝায়। সেই হিসেবে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী অর্থ নবীর জন্মকালের খুশি, পৃথিবীতে তাঁর শুভাগমনকে উপলক্ষ করে বৈধ আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে আনন্দ উদ্যাপন করা।
জশ্নে জুলুস ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাসাল্লাম উদ্যাপন করা একটি বৈধ ও পূণ্যময় আমল ঃ
হাদিস শরীফে আছে-
مَنْ سَنَّ فِي الإِسْلامِ سُنَّةً حَسَنَةً ، فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ غَيْرِ أَنْ يُنْتَقَصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ ، وَمَنْ سَنَّ فِي الإِسْلامِ سُنَّةً سَيِّئَةً فَلَهُ وِزْرُهَا وَوِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ غَيْرِ أَنْ يُنْتَقَصَ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَيْ
হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে ভাল তরিকা প্রচলন করল সে নিজের নেকী, তৎপরে যারা তদানুযায়ী আমল করল তাদের নেকী সে প্রাপ্ত হবে। তাদের নেকী হতে কিছু পরিমাণ কম করা হবে না। (মিশকাত- ৩৩, বায়হাকী ১/৩৮৪)
মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ রহ্মাতুল্লাহি আলাইহি‘র ১৪৪ পৃষ্ঠায় একটি মারফু হাদিস উদ্ধৃত আছে :
لقد روى عن النبى صلى الله عليه وسلم ما راه المؤمنون حسنا فهو عند الله حسن وما رواه المؤمنون قببيحا فهو عند الله قبيح-
অর্থ: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করা হয়েছে। (তিনি বলেছেন) মুমিনগণ যে কাজকে ভাল বিবেচনা করে তা আল্লাহ র নিকট ভাল আর মুমিনগণ যে কাজকে মন্দ বিবেচনা করে, তা আল্লাহ র নিকট মন্দ। (বুখারী ১/২৬৯ পৃষ্ঠার হাশিয়া # ৬)
সম্মানিত পাঠক, ইসলামী শরীয়তের আলোকে পবিত্র জশ্নে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুষ্ঠানের আয়োজন করা, এতে সহযোগীতা করা এবং যোগদান করা অতীব পূণ্যময় ও বরকতময় একটি আমল। এ দাবীর অনুকূলে নির্ভরযোগ্য প্রমাণাদি আপনাদের সামনে তুলে ধরা হলো। তার পূর্বে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুষ্ঠানগুলোর কাঠামো ও কর্মসূচী কি রকম হওয়া চাইÑ এ বিষয়টি জানা প্রয়োজন। এ কাঠামো ও কর্মসূচীগুলো নির্ধারণ করার জন্য পূর্ববর্তী ওলামায়ে কেরাম এবং বুজুর্গানে দ্বীনের উদ্ধৃতি ও মতামতের অনুসরণ প্রয়োজন। যাতে কেউ একথা বলতে না পারে যে, মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদ্যাপন করা বর্তমান যুগের আবিস্কার। এর ফলে একজন সাধারণ পাঠকও বর্তমান প্রচলিত মিলাদুন্নবী মাহফিলের কাঠামো এবং তুলণামূলক ধারণা পেতে সক্ষম হবে, মিল-অমিলের স্বরূপ খুঁজে পাবে।

ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাহফিলের কাঠামো ঃ
সম¥ানিত পাঠক, বর্তমান যুগে কেহ কেহ বলে থাকেন, আমাদের দেশে প্রচলিত মিলাদ আর পূর্বযুগের মিলাদ এক নয়। এ’দুয়ের পার্থক্যের একটা মেরুদন্ড নির্মাণ করে উনারা প্রচলিত মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুষ্ঠানকে অবৈধ, হারাম ইত্যাদি ফতোয়া দিয়ে থাকেন। বিষয়টি খোলাসা করা প্রয়োজন। আমাদের দেশের মিলাদ-মাহফিল বলতে কি বুঝায়? বলবেন, মানুষদের একত্রিত হওয়া, সম্মেলন করা, জুলুস তথা শোভাযাত্রা বের করা, আনন্দ প্রকাশে না'তে রাসুল পরিবেশন করা, নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর শান-মান আলোচনা করা, কুরআন-খানি ও দরূদ শরীফ তেলাওয়াত করা, দান-সদকা ও তাবাররুকাতের ব্যবস্থা করা, লাইটিং ও ডেকোরেশন করে মাহফিলটাকে মনোগ্রাহী সাজে সাজানো সর্বোপরী প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি প্রেম ভালবাসা প্রদর্শন করা ইত্যাদি। এ-ই আমাদের দেশের বর্তমানকার মিলাদ মাহফিলের কাঠামো ও কর্মসূচী।
এবার পূর্ববর্তী কয়েকজন ওলামায়ে কেরামের প্রদত্ত কাঠামো তুলে ধরা হলোÑ যাদের গ্রহণযোগ্যতা সর্বকালে, সর্বযুগে এবং প্রশ্নাতীত।
বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, “মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদ্যাপনের করণীয়তার ক্ষেত্রে আমাদের উচিত হবে পূর্বে উল্লেখিত কার্যাদির উপর সীমাবদ্ধতা থাকা, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপনের বিষয়টি বুঝা যায়। যেমন- কুরআন তেলাওয়াত, দান-সদকা করা, পানাহার করানো, নবীর শান-মান সম্বলিত কবিতা তথা না'তে রাসুল আবৃত্তি করা এবং এমন সব আধ্যাতিক গজল পরিবেশন করা যেগুলো অন্তরাত্মাকে পারলৌকিক কল্যাণকর নেক আমল করতে তাড়িত করে, জাগিয়ে তোলে”। আল হাভী লিল ফতওয়া, কৃত: আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতী (রহ:)।
হাফিজুল হাদিস আল্লামা শামসুদ্দীন মুহাম্মদ সাখাভী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি থেকেও মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাহফিলের অনুরূপ কাঠামো পাওয়া যায়। তিনি মিশর এবং সিরিয়ার মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাহফিলের কাঠামো বর্ণনা করার সময় উপরুক্ত কর্মসূচীগুলোর সাথে উত্তম পোশাক পরিধান করা, পানীয় ব্যবস্থা করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, আলোকসজ্জা করা ইত্যাদির কথা উল্লেখ করেন। আল মাওরেদুর রাভী, ৮৫ কৃত: আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রহ:)।
জগদ্বিখ্যাত হাদীস বিশারদ মোল্লা আলী ক্বারী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কর্মসূচীগুলোকে পর্যায়ক্রমে সাজিয়েছেন এভাবে, “বিভিন্ন খতম পড়া, অবিরাম কুরআন তেলাওয়াত করা, উচ্চ আওয়াজে না’ত বা গজল আবৃত্তি করা, বিভিন্ন প্রকারের বৈধ আনন্দ ও খুশি উদ্যাপন করা এবং উন্নত ভোজন সামগ্রী তথা তাবাররুকাতের এন্তেজাম করা”।আল মাওরেদুর রাভী, কৃত: আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রহ:)।
সম্মানিত পাঠক, হাদীস শাস্ত্রে আবু জুরআ রাজী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি এর নাম জানেনা এরকম মুহাদ্দিস পৃথিবীতে এসেছে কিনা সন্দেহ। তিনি হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর জগদ্বিখ্যাত হাদীস বিশারদ ছিলেন। ৩৭৫ হিজরীতে তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। সমসাময়িক এবং পরবর্তী যুগের সমস্ত মুহাদ্দিস উনার নাম শুনলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত করতে বাধ্য হন। মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর আনুষ্ঠানিকতার শরয়ী ফয়সালা সম্পর্কে উনাকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। উত্তরে তিনি যে কথা বলেছিলেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণÑ ‘ওলীমার আয়োজন করা এবং মানুষদেরকে আহার করানো সর্বাবস্থায়ই যখন মোস্তাহাব, তখন মর্যাদাপূর্ণ এই রবিউল আওয়াল মাসে নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নবুয়্যতের নূর প্রকাশিত হওয়ার আনন্দের সাথে উপরোক্ত বিষয়গুলো সংযোজিত হলেতো আর এর বৈধতা ও বরকতময়তার ব্যাপারে প্রশ্নই থাকেনা। সলফে সালেহীন থেকে এ মতামতের বিপরীত কোন কিছুই আমার জানা নেই। (রুহুস সিয়ার)
সম্মানিত পাঠক! মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুষ্ঠানকে যারা এ যুগের আবিস্কার বলে অপপ্রচার চালায় ইমাম আবু জুরআ রাজী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি এর কাছ থেকে তাদের নতুন করে সবক নেওয়া উচিত। তিনি দু’এক শতাব্দী আগের ইমাম নন বরং সেই হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর জগদ্বিখ্যাত হাদীস বিশারদ। তিনি বিশেষ কাঠামোয় ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুষ্ঠানকে বৈধ বলে ফতোয়া দিয়ে গেছেন।
সুতরাং মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদ্যাপনের কাঠামোগুলো হল, ১. নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর আগমনের ঘটনাবলী ও শান-মান আলোচনা করা। ২. সম্মেলন তথা জশ্নে জুলূছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম Ñএর আয়োজন করা। ৩. কুরআন তেলাওয়াত, না'তে রাসুল ও গজল আবৃত্তি করা। ৪. বেশী বেশী নেক আমল করা। ৫. মানুষদেরকে পানাহার করানো তথা তাবাররুক পরিবেশন ও দান-সদকা করা। ৬. দরূদ শরীফ পাঠ করা। ৭. আলোকসজ্জা করা। ৮. সুগন্ধি ব্যবহার করা। ৯. আনন্দ উদ্যাপন করা। ১০. উন্নত বস্ত্র পরিধান করা ইত্যাদি।
প্রিয় পাঠক, নিম্নের কথাগুলো অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করুন। তাহলে দেখতে পাবেন, সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে প্রত্যেক যুগেই ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচীতে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদ্যাপিত হয়ে আসছে।

ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর অর্ন্তনিহিত তত্ত্ব ঃ
উপরে দশটি বাস্তব কর্মসূচীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সম্ভাব্য অন্যান্য বৈধ কর্মসূচীর মাধ্যমেও ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদ্যাপন করা যায়। তবে এ সকল কর্মসূচী ও আনুষ্ঠানিকতার নিগুঢ়তত্ত্ব একটাইÑ আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে শুভাগমন করা আল্লাহর অপার অনুগ্রহ, নিয়ামত ও রহমত।
যেমন, ইবনে হাজর আসকালানী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
واى نعمة اعظم من النعمة ببروز هذا النبى نبى الرحمة فى ذالك اليوم
অর্থঃ রহমতের এ নবী আমাদের মাঝে শুভাগমন করেছেনÑ এর চেয়ে বড় নিয়ামত আর কি হতে পারে। আল হাভী লিল ফতওয়া, কৃত: আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতী (রহ:)।
আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
ان بعث الرسول ليس بواجب عليه سبجانه الا بموجب وعده وفضله وكرمه على عباده-
অর্থঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্রেরণ করা আল্লাহর উপর আবশ্যক নয়। শুধুমাত্র বান্দার উপর অনুগ্রহ ও দয়ার পরশ হয়ে এবং প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অনুসারেই তাঁকে প্রেরণ করেছেন। আল মাওরেদুর রাভী, কৃত: আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী।
আল্লামা আবু শায়েখ রহমাতুসাল্লামহি আলাইহি বলেন :
عن ابن عباس رضي الله عنهما ان الفضل العلم والرحمة محمد صلى الله تعالى عليه وسلم (روح المعانى)
অর্থ: হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহুতা’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত, ফজল হল ইলম, আর রহমত হল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম । (রুহুল মায়ানী ১০/১৪১)
সুতরাং প্রমাণিত হলো, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর শুভাগমন আমাদের জন্য আল্লাহর রহমত, দয়া-করুণা ও অফুরন্ত নিয়ামত স্বরূপ। এ নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করাই ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম Ñএর নিগুঢ় তত্ত্ব ও রহস্য।
ইমাম সুয়ূতী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহিÑএর ভাষায় শুনুন,
فيستحب لنا اظهار الشكر بمولده عليه الصلاة والسلام-
অর্থঃ যেহেতু প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর শুভাগমন আমাদের জন্য রহমত, সেহেতু তাঁর শুভাগমনের শুকরিয়া আদায় করা আমাদের জন্য মোস্তাহাব। আল হাভী লিল ফতওয়া, কৃত: আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতী (রহ:)।
ইবনে হাজর আসকালানী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
ما يفهم منه الشكر لله تعالى
অর্থঃ যে সমস্ত কর্মসূচীর মাধ্যমে আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করা যায় তা দিয়েই মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন করা চাই। আল হাভী লিল ফতওয়া, কৃত: আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতী (রহ:)।