12 Rabiul Awwal লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
12 Rabiul Awwal লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৫

eid -e- milad-un nabi | বিভিন্ন নবীদের যুগে ঈদে মিলাদুন্নবী (দঃ) এর প্রমান ।

মুফতি মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল আলী কাদেরী

কামিল (হাদিস, ফিক্হ) বি.এ (অর্নাস)

সহ -সুপার, কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা (মহিলা শাখা)

নবীদের যুগে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
১। হযরত আদম আলাইহিস সালাম’র মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন ঃ
হযরত আদম আলাইহিস সালাম কে সৃষ্টি করার পর যখন একাকী বেহেস্তের মধ্যে অবস্থান করেছেন, তখন তাঁর বাম পাজরের হাড় দিয়ে হযরত হাওয়া আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করা হল। হযরত হাওয়া আলাইহিস সালামকে দেখে হযরত আদম আলাইহিস সালাম সামনে অগ্রসর হতে চাইলে আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে নির্দেশ এল তাঁকে আক্বদ এবং মোহরানা ধার্যের পূর্বে স্পর্শ করতে পারবে না। অতঃপর আল্লাহ র হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘র মিলাদে পাকের মাধ্যমে আক্বদ সম্পন্ন করা হল। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘র উপর ১০ বার দরূদ শরীফ পাঠকে মোহরানা ধার্য করা হল। উক্ত বিবাহর খুৎবার মধ্যে আল্লাহ তা’য়ালা স্বয়ং নিজের প্রশংসা করার পর ইরশাদ করেন :
محمد حبيبى ورسولى انى قد زوجت الاشياء ليدلوا به على وحدنية--- يا ادم وياحوا اسكعا جنبى وكلا من ثمرتي-
অর্থ: হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার প্রিয় ও আমার রাসুল। আমি প্রত্যেক জিনিসকে (জীব) জোড়া জোড়া করে তৈরি করে দিলাম, যাতে এসব আমার ওহাদানিয়াতের ওপর দলিল হয়। (মাদারেজুন নবুয়ত)
আরেক বর্ণনায় এসেছে : হযরত আদম আলাইহিস সালাম হযরত হযরত আমেনা রাদিয়াল্লাহুতা’য়ালা আনহার স্বপ্নের মধ্যে আসলেন এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সম্বোধন করে বলেন :
مرحبا بك يامحمد صلى الله تعالى وعليك وسلم
অর্থ: হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে ধন্যবাদ, স্বাগতম।
হযরত আমেনা রাদিয়াল্লাহুতা’য়ালা আনহা জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কে? আপনার পরিচয় দিন। উত্তর আসল আমি আবুল বশর আদম আলাইহিস সালাম। হযরত আমেনা রাদিয়াল্লাহুতা’য়ালা আনহা বলেন, আপনি কি চান? উত্তরে বললেন :
ابشرى ياامنة فقد حملت بسيد البشر وفخر ربيعة ومضر-
অর্থ: হে আমেনা খাতুন! সুসংবাদ মানবজাতির সরদার ও রবীয়া ও মুযর গোত্রের গৌরবময়ী নুরানী সত্তাকে তুমি ধারণ করছো।
রেয়াজুল মুযাককেরীনের বর্ণনা দিয়ে মায়ারেজুন নবুয়ত কিতাবে হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহুতা’য়ালা আনহু হতে বর্ণনা এসেছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
ان ادم عليه السلام لما نظر الى ساق العرش راى مكتوبا عليه لااله الا الله محمد رسول الله من اذنب ذنبا فلا مغفرة ولاتوبة له الابالصلوة على محمد عبده-
অর্থ: হযরত আদম আলাইহিস সালাম আরশের পায়াতে দৃষ্টিপাত করার পর দেখতে পেলেন, সেখানে লেখা আছে لااله الا الله محمد رسول الله এর পর লেখা আছে, যে ব্যক্তি কোন গুনাহ করবে তার জন্য ক্ষমা ও তওবা নেই; যতক্ষণ না আল্লাহ র হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘র উপর দরূদ পড়ে।
২। হযরত নূহ আলাইহিস সালাম‘র মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন:
হযরত নূহ আলাইহিস সালাম‘র উম্মতদের শাস্তি দেওয়ার নিমিত্তে প্লাবনের মাধ্যমে তাদের ধ্বংস করার অভিপ্রায় আল্লাহ পাক তাঁকে ও তাঁর অনুসারীদের হেফাজতের লক্ষ্যে কিশতী বানানোর নির্দেশ দেন। যখন হযরত নূহ আলাইহিস সালাম‘র প্রতি কিশতী তৈরীর হুকুম আসল, তখন কিশতীর কাঠামো তৈরীর জন্য নবীদের সংখ্যানুপাতে ১ লক্ষ ২৪ হাজার কাঠ আসে। অলৌকিভাবে প্রত্যেক কাঠে এক এক নবীর নাম অঙ্কিত ছিল। সেই কাঠসমূহ দিয়ে কিশতী নির্মাণ কাজ শেষ করলে নবীদের নাম মুছে যায়। অতঃপর আল্লাহ র পক্ষ থেকে হযরত নূহ আলাইহিস সালাম‘র প্রতি নির্দেশ আসল যে, আমার (আল্লাহ) নাম নিয়ে শুরু করবে আর আমার বন্ধু (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নাম নিয়ে কিশতীর কাজ শেষ করবে। সে অনুযায়ী শুরু করলে আরও ৪টি কাঠের প্রয়োজন দেখা দেয়। পরদিন ৪টি তক্তা ইসলামের চার খলিফার নামে আসে। সেগুলো সংযুক্ত করে দিলে কিশতী তৈরি হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে আল্লামা জামী রহ্মাতুল্লাহি আলাইহি বলেন- “আগর নামে মুহাম্মদ রা নহ আ ওয়ারদে সফী আদম, না আদম ইয়া ফতে তুবা নহ নুহ আয গরক্ব নাজজায়না”।
অর্থ: হযরত আদম আলাইহিস সালাম যদি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘র নাম মোবারকের অছিলা নিয়ে দোয়া না করতেন, তাহলে তাঁর তওবা কবুল হত না, আর নবীপাকের নামের অছিলায় হযরত নূহ আলাইহিস সালাম তুুফান থেকে মুক্তি পেলেন।
হযরত নূহ আলাইহিস সালাম এসে আল্লাহ র হাবীবের প্রতি সালাম জানিয়ে বলেন :السلام عليك ياحبيب الله হযরত আমেনা খাতুন রাদিয়াল্লাহুতা’য়ালা আনহা তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে, তিনি বলেন আমি হযরত নূহ আলাইহিস সালাম। আরো বলেন :
ابشرى ياامنة فقد حملت بصاحب النصر والفتوح
অর্থ: সুসংবাদ হে আমেনা! আপনি গর্ভধারণ করেছেন বিজয় এবং বিজয় অর্জনকারীকে।
৩। হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম‘র মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন
হযরত আবু উমামা বাহেলী রাদিয়াল্লাহুতা’য়ালা আনহু হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ হাদিস বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরমান হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম একবার স্বপ্নের মধ্যে জান্নাত পরিভ্রমণ করেন। জান্নাতের বিশালতা দেখে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এ বেহেস্ত কার জন্য এবং এটা কার মালিকানাধীন? উত্তর আসল :
اعيدت محمد صلى الله تعالى عليه واله وسلم وامته-
অর্থ: আমি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর উম্মতের জন্য সৃষ্টি করেছি। অতঃপর হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম বেহেস্তের বাগিচার গোড়ার দিকে অবলোকন করে দেখতে পেলেন,
شهادة ان لا اله الا الله-
দ্বারা গাছের গোড়ালী তৈরি আর কান্ডের প্রতি অবলোকন করে দেখতে পেলেন মুহাম্মদ রাসুলুসাল্লামহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বারা কান্ড তৈরি। আর ফুলের দিকে অবলোকন করে দেখতে পেলেন। سبحان الله والحمد لله দ্বারা ফুলের কাঠামো তৈরি আছে।
হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এ স্বপ্ন তাঁর কওমের নিকট বর্ণনা করলে, তারা তাঁর নিকট হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উম্মতের পুরো বিবরণ জানতে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম সেজদায় পড়লেন এবং আল্লাহ র নিকট নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘র শান-মান সম্পর্কে পুর্ণাঙ্গ বিবরণ অবগত হবার জন্য আবেদন জানালেন। অতঃপর হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালাম এসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘র পুর্ণাঙ্গ বিবরণ অবগত করালেন এবং সুসংবাদ দিলেন যে তিনি আপনার ও আপনার বংশধরের মাধ্যমে দুনিয়াতে তাশরীফ আনবেন। এ বর্ণনা শুনে হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালামের মাথায় হাত রেখে বললেন যে :
يارب اجعلنى من امته صلى الله عليه وسلم
হে আল্লাহ ! আমাকে তাঁর উম্মতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন। হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এসেও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে লক্ষ্য করে বিবি আমেনাকে সালাম দিয়েছেন।
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (১২৯
৪। হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম‘র মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন:
গর্ভধারণের ৭ম মাসে হযরত ইসমাঈল জবিহুসাল্লামহ এসে আল্লাহ র হাবিবকে বলেন-
السلام عليكم يا امنة من اختاره الله
আমেনা রাদিয়াল্লাহুতা’য়ালা আনহা‘র জবাবে তিনি তাঁর পরিচয় দিয়ে বলেন: ابشرى يا امنة فقد حملت بالنبى الرجيح المليح
অর্থ: সুসংবাদ আমেনা আপনি উজ্জ্বল সর্বক্ষেত্রে প্রধান্য বিস্তারকারী নবীকে গর্ভধারণ করেছেন।কথিত আছে, হযরত ইব্রাহিম খলিলুসাল্লামহ ও ইসমাঈল জবিহুসাল্লামহ যখন খানায়ে কা‘বা নির্মাণ করেন তখন তাঁরা আল্লাহ র নিকট এ নবীর জন্য দোয়া করেছিলেন যা পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আছে।
৫। হযরত মুসা আলাইহিস সালাম‘র মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন
অষ্টম মাসে হযরত মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর হাবিবকে বললেন,
السلام عليكم ياخير الله
তিনি হযরত আমেনা রাদিয়াল্লাহুতা’য়ালা আনহা‘র নিকট নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, আমি মুসা আলাইহিস সালাম। তিনি সুসংবাদ দেন,
ابشرى ياامنة فقد حملت بمن ينزل عليك القران.
অর্থ: হে আমেনা! আপনাকে সুসংবাদ। আপনি এমন নবীকে গর্ভধারণ করেছেন, যার উপর কোরআন নাযিল হবে।
৬। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম‘র মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন ও কিয়াম ঃ
নবম মাসে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম নবীকে এসে সালাম দেন,
السلام عليكم يا خاتم رسول اللهতাঁকে হযরত আমেনা রাদিয়াল্লাহুতা’য়ালা আনহা পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে, তিনি বলেন, আমি ঈসা (আলাইহিস সালাম) এবং সুসংবাদ দেন-
ابشرى ياامنة حملت بالنبى الكرم والرسول المعظم وزال عنك لبؤس والعنا والسقم والالم-
অর্থ: হে আমেনা! আপনাকে সুসংবাদ। আপনি এমন একজন নবীকে গর্ভধারণ করেছেন, যিনি নবীদের মধ্যে মহানবী ও রাসুলদের মধ্যে মহান রাসুল। তাঁর মাধ্যমে আপনার থেকে দুঃখ-দুর্দশা, ভয়-ভীতি, ব্যথা-বেদনা উপশম করেছেন।
وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ فَلَمَّا جَاءَهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ قَالُوا هَذَا سِحْرٌ مُبِينٌ (৬
কিতাবে বর্ণিত আছে সকল পয়গম্বর তাঁদের স্ব স্ব উম্মতের নিকট রাসুল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘র আগমনের শুভ সংবাদ দিয়েছেন”। যেমন হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এর কথা পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আছে অর্থ: আমি আমার পরে এমন একজন রাসুলের আগমনের শুভ সংবাদ দিচ্ছি যার পাক নাম হবে ‘আহমদ’। (সুরা সফ-৬)

ফেরেস্তাদের মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন
রাসুলুসাল্লামহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বেলাদতের রাতে ফেরেস্তাগণ হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালাম‘র নেতৃত্বে হযরত আমেনা রাদিয়াল্লাহুতা’য়ালা আনহা‘র ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সালাত ও সালাম পাঠ করে ছিলেন। তাতে বোঝা যায় যে, মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘সুন্নাতে মালাইকা’। ফেরেস্তাদের মিলাদে আওয়াজ শুনে শয়তান পলায়ন করেছে। অতএব, যারা এ হবে তারা তা হবে।
হযরত সুফিয়া রাদিয়াল্লাহুতা’য়ালা আনহা বলেন, বেলাদতের সাথে সাথেই তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছিল : لااله الا الله আর ফেরেস্তাগণ যে, তাঁকে السلام عليك يا رسول الله বলেছিলেন আমি নিজ কানে তা শুনেছি। (আন নি’মাতুল কুবরা- ৯-১২ পৃষ্ঠা)

হুরদের মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন ও কিয়াম ঃ
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাসাল্লামমের পবিত্র আগমনলগ্নে বেহেশতের হুরেরা হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সংবর্ধনা জানিয়েছেন। হযরত আমেনা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা হতে বর্ণিত,
قَالَتْ ثُّمَ اَخَذَنَىِ مَايَاْخُذُ النَّسَاءَ فَسَمِعَتُ وَجَيَةً عَظِيْمَةً ثُمَّ رَايْتُ كَانَ جَنَاحُ طَائِرِ اَبْيَضُ قَدْ مَسَحَ عَلَى فُوَاِدىْ فَذَهَبَ عَنِّى الرَّعْبُ وَكُلُّ وَجْعِ اَجِدْهُ ثُمُّ الْتَفَتَّ فَاِذَا اَنَا بِشَرْبَةِ بَيْضَاَء فَتَنَاوَ لْتُهَا فَاِذَاهِىْ اَعْلَى مِنَ الْعَسْلِ فَاَصَابَنِى نُوْرٌعَالِ ثُمَّ رَايْتُ نِسْوَةَ كَالنَّحْلِ طِوَالًا كَاَنَّهُنَّ مِنْ بَنَاتِ عَبْدِ مَنَافِ يُحَدِّقْنَ بِىْ فَبَيْنَمَا اَنَا اَتَعَجَّبُ وَاَقْوَلُ وَاَغُوْثَاهُ مِنْ اَيْنَ عَلِمْنَ فَقُلْنَ بِىْ نَحْنُ اَسْيَةُ اِمْرَاَةُ فِرْعَوْنَ وَمَرْيَمَ اِبْنَةَ عِمْرَانَ وَهَوُلَاءِ مِنَ الْحُوْرِ الْعِيْنِ-
অর্থ: তিনি বলেন, মহিলাদের ন্যায় আমার যখন প্রসব বেদনা শুরু হল, তখন আমি একটি বিকট আওয়াজ শুনলাম। যদ্দরুন আমার মধ্যে ভীতি সঞ্চারিত হয়। অতঃপর আমি দেখলাম যে, একটি ধুসর বরণ পাখির পালক আমার হৃদয় ছুঁয়ে দিল, ফলে আমার সব রকম ভয়-ভীতি ও ব্যথা বিদূরিত হতে লাগল। অতঃপর আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হতেই হঠাৎ দেখলাম যে, আমার সামনে সাদা পানীয় (শরবত) পেশ করা হল এবং আমি তা পান করলাম; যা ছিল মধু থেকে মিষ্ট। এরপর একটি নূরের বৃত্ত আমাকে পরিবেষ্টন করল। আমি দেখলাম, এমন কতগুলো সুন্দরী রমনীদেরকে যাদের গঠন প্রকৃতি লম্বায় খেজুর বৃক্ষ ও আবদে মুনাফের কন্যাদের মতো মনে হচ্ছিল। তারা আমাকে তাদের অঙ্গনে নিয়ে গেল। তখন আমি এ ভেবে হয়রান হয়ে গেলাম যে, এরা কোত্থেকে এল এবং তাঁরা এ বেলাদতের সংবাদ কি করে অবগত হল! তখন তাঁরাই বলল, আমি ফেরআউনের বিবি আছিয়া এবং আমি ইমরান তনয়া মরিয়ম আমাদের সাথে এরা হল জান্নাতের হুর। (আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলম, আনওয়ারে মুহাম্মদী, ২য় খন্ড, ৩৩পৃষ্ঠা)
মুফতি মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল আলী কাদেরী
কামিল (হাদিস, ফিক্হ) বি.এ (অর্নাস)
সহ -সুপার, কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা (মহিলা শাখা)
মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

eid -e- milad-un nabi | কুরআন ও হাদীসের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (১ম পর্ব)

মুফতি মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল আলী কাদেরী

কামিল (হাদিস, ফিক্হ) বি.এ (অর্নাস)

সহ -সুপার, কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা (মহিলা শাখা)

মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭


بسْمِ اللهِ الرََّحْمَنِ الرَحِيْم
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা’য়ালার জন্য যিনি প্রিয় হাবীবের ‘মিলাদ’ তথা শুভাগমনের মাধ্যমে নবুয়তের দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। অসংখ্য দুরূদ ও সালাম সেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাসাল্লামমের উপর যার পবিত্র মিলাদ এর বার্তাবাহক ছিলেন হযরত বাবা আদম আলাইহিস সালাম থেকে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম পর্যন্ত সকল নবী-রাসূল।
মানবতার কান্ডারী, মুক্তির দিশারী রাহমাতুল্লিল আলামীন হযরত আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১২ই রবিউল আওয়াল ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে সোমবার সোবহে সাদিকের সময় দুনিয়ায় শুভ আগমন করেন।
সত্যের মাপকাঠি সাহাবায়ে কেরাম থেকে বিশুদ্ধরূপে বর্ণিত হয়েছে যে, ১২ই রবিউল আওয়াল শরীফ প্রিয় নবী হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম Ñএর পবিত্র শুভ আগমনের দিন। যেমন, হাফেজ আবূ বকর ইবনে আবী শায়বাহ্ (ওফাত ২৩৫ হিজরী) সহীহ সনদ সহকারে বর্ণনা করেছেন,
عن جابر وابن عباس انهما قالا ولد رسول الله عليه وسلم عام الفيل يوم الاثنين الثانى عشر من شهر ربيع الاول-
অর্থঃ হযরত জাবের ও হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বীয়াল্লাহু আনহুম বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম Ñএর বেলাদত শরীফ ঐতিহাসিক ‘হস্তি বাহিনী বর্ষের’ (যে বছর আবরাহা তার হস্তিবাহিনী নিয়ে কা’বা শরীফ ধ্বংস করতে এসে নিজে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছিল) ১২ই রবিউল আওয়াল সোমবার হয়েছিললুগুল আমান ফী শরহি ফাতহির রব্বানী, খন্ড ২, পৃষ্ঠা-১৮৯, বৈরুত; আল বেদায়া ওয়ান নিহায়া, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৮৯, বৈরুত]
যুগে যুগে সারা বিশ্বের ঈমানদার মুসলমানগণ শরীয়ত সম্মত উপায়ে মিলাদুন্নবী দিবসে জশ্নে জুলূস ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন করে আসছে। এই জুলূস ঈমানদারদের ঈমানী খোরাক। শরীয়তের আলোকে এর দলিল ও ফজিলত আলোকপাত করা হলো।


জশ্নে জুলূস অর্থ ঃ
আরবীতে ‘জশন’ শব্দের অর্থ খুশি বা আনন্দ (লুগাতে কিশওয়ারী) ‘জুলূস’ শব্দটি ‘জলসা’ শব্দের বহুবচন এর অর্থ হলো বসা বা উপবেশন। আর ফার্সিতেÑ ‘জশন’ শব্দের অর্থ উৎসব, রাজকীয় অনুষ্ঠান এবং ‘জুলূস’ শব্দের অর্থ হল আড়ম্বর, মিছিল করা। (ফরহাঙ্গ-ই-রব্বানী)।

ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্থ ঃ
প্রচলিত অর্থে ঈদ মানে খুশি। মিলাদ (ميلاد) অর্থ জন্মকাল বা জন্মের সময়। মাওলিদ (مولد) শব্দটিও অভিন্ন অর্থ বুঝায়। সেই হিসেবে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী অর্থ নবীর জন্মকালের খুশি, পৃথিবীতে তাঁর শুভাগমনকে উপলক্ষ করে বৈধ আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে আনন্দ উদ্যাপন করা।
জশ্নে জুলুস ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাসাল্লাম উদ্যাপন করা একটি বৈধ ও পূণ্যময় আমল ঃ
হাদিস শরীফে আছে-
مَنْ سَنَّ فِي الإِسْلامِ سُنَّةً حَسَنَةً ، فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ غَيْرِ أَنْ يُنْتَقَصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ ، وَمَنْ سَنَّ فِي الإِسْلامِ سُنَّةً سَيِّئَةً فَلَهُ وِزْرُهَا وَوِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ غَيْرِ أَنْ يُنْتَقَصَ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَيْ
হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে ভাল তরিকা প্রচলন করল সে নিজের নেকী, তৎপরে যারা তদানুযায়ী আমল করল তাদের নেকী সে প্রাপ্ত হবে। তাদের নেকী হতে কিছু পরিমাণ কম করা হবে না। (মিশকাত- ৩৩, বায়হাকী ১/৩৮৪)
মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ রহ্মাতুল্লাহি আলাইহি‘র ১৪৪ পৃষ্ঠায় একটি মারফু হাদিস উদ্ধৃত আছে :
لقد روى عن النبى صلى الله عليه وسلم ما راه المؤمنون حسنا فهو عند الله حسن وما رواه المؤمنون قببيحا فهو عند الله قبيح-
অর্থ: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করা হয়েছে। (তিনি বলেছেন) মুমিনগণ যে কাজকে ভাল বিবেচনা করে তা আল্লাহ র নিকট ভাল আর মুমিনগণ যে কাজকে মন্দ বিবেচনা করে, তা আল্লাহ র নিকট মন্দ। (বুখারী ১/২৬৯ পৃষ্ঠার হাশিয়া # ৬)
সম্মানিত পাঠক, ইসলামী শরীয়তের আলোকে পবিত্র জশ্নে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুষ্ঠানের আয়োজন করা, এতে সহযোগীতা করা এবং যোগদান করা অতীব পূণ্যময় ও বরকতময় একটি আমল। এ দাবীর অনুকূলে নির্ভরযোগ্য প্রমাণাদি আপনাদের সামনে তুলে ধরা হলো। তার পূর্বে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুষ্ঠানগুলোর কাঠামো ও কর্মসূচী কি রকম হওয়া চাইÑ এ বিষয়টি জানা প্রয়োজন। এ কাঠামো ও কর্মসূচীগুলো নির্ধারণ করার জন্য পূর্ববর্তী ওলামায়ে কেরাম এবং বুজুর্গানে দ্বীনের উদ্ধৃতি ও মতামতের অনুসরণ প্রয়োজন। যাতে কেউ একথা বলতে না পারে যে, মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদ্যাপন করা বর্তমান যুগের আবিস্কার। এর ফলে একজন সাধারণ পাঠকও বর্তমান প্রচলিত মিলাদুন্নবী মাহফিলের কাঠামো এবং তুলণামূলক ধারণা পেতে সক্ষম হবে, মিল-অমিলের স্বরূপ খুঁজে পাবে।

ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাহফিলের কাঠামো ঃ
সম¥ানিত পাঠক, বর্তমান যুগে কেহ কেহ বলে থাকেন, আমাদের দেশে প্রচলিত মিলাদ আর পূর্বযুগের মিলাদ এক নয়। এ’দুয়ের পার্থক্যের একটা মেরুদন্ড নির্মাণ করে উনারা প্রচলিত মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুষ্ঠানকে অবৈধ, হারাম ইত্যাদি ফতোয়া দিয়ে থাকেন। বিষয়টি খোলাসা করা প্রয়োজন। আমাদের দেশের মিলাদ-মাহফিল বলতে কি বুঝায়? বলবেন, মানুষদের একত্রিত হওয়া, সম্মেলন করা, জুলুস তথা শোভাযাত্রা বের করা, আনন্দ প্রকাশে না'তে রাসুল পরিবেশন করা, নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর শান-মান আলোচনা করা, কুরআন-খানি ও দরূদ শরীফ তেলাওয়াত করা, দান-সদকা ও তাবাররুকাতের ব্যবস্থা করা, লাইটিং ও ডেকোরেশন করে মাহফিলটাকে মনোগ্রাহী সাজে সাজানো সর্বোপরী প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি প্রেম ভালবাসা প্রদর্শন করা ইত্যাদি। এ-ই আমাদের দেশের বর্তমানকার মিলাদ মাহফিলের কাঠামো ও কর্মসূচী।
এবার পূর্ববর্তী কয়েকজন ওলামায়ে কেরামের প্রদত্ত কাঠামো তুলে ধরা হলোÑ যাদের গ্রহণযোগ্যতা সর্বকালে, সর্বযুগে এবং প্রশ্নাতীত।
বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, “মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদ্যাপনের করণীয়তার ক্ষেত্রে আমাদের উচিত হবে পূর্বে উল্লেখিত কার্যাদির উপর সীমাবদ্ধতা থাকা, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপনের বিষয়টি বুঝা যায়। যেমন- কুরআন তেলাওয়াত, দান-সদকা করা, পানাহার করানো, নবীর শান-মান সম্বলিত কবিতা তথা না'তে রাসুল আবৃত্তি করা এবং এমন সব আধ্যাতিক গজল পরিবেশন করা যেগুলো অন্তরাত্মাকে পারলৌকিক কল্যাণকর নেক আমল করতে তাড়িত করে, জাগিয়ে তোলে”। আল হাভী লিল ফতওয়া, কৃত: আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতী (রহ:)।
হাফিজুল হাদিস আল্লামা শামসুদ্দীন মুহাম্মদ সাখাভী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি থেকেও মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাহফিলের অনুরূপ কাঠামো পাওয়া যায়। তিনি মিশর এবং সিরিয়ার মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাহফিলের কাঠামো বর্ণনা করার সময় উপরুক্ত কর্মসূচীগুলোর সাথে উত্তম পোশাক পরিধান করা, পানীয় ব্যবস্থা করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, আলোকসজ্জা করা ইত্যাদির কথা উল্লেখ করেন। আল মাওরেদুর রাভী, ৮৫ কৃত: আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রহ:)।
জগদ্বিখ্যাত হাদীস বিশারদ মোল্লা আলী ক্বারী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কর্মসূচীগুলোকে পর্যায়ক্রমে সাজিয়েছেন এভাবে, “বিভিন্ন খতম পড়া, অবিরাম কুরআন তেলাওয়াত করা, উচ্চ আওয়াজে না’ত বা গজল আবৃত্তি করা, বিভিন্ন প্রকারের বৈধ আনন্দ ও খুশি উদ্যাপন করা এবং উন্নত ভোজন সামগ্রী তথা তাবাররুকাতের এন্তেজাম করা”।আল মাওরেদুর রাভী, কৃত: আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রহ:)।
সম্মানিত পাঠক, হাদীস শাস্ত্রে আবু জুরআ রাজী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি এর নাম জানেনা এরকম মুহাদ্দিস পৃথিবীতে এসেছে কিনা সন্দেহ। তিনি হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর জগদ্বিখ্যাত হাদীস বিশারদ ছিলেন। ৩৭৫ হিজরীতে তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। সমসাময়িক এবং পরবর্তী যুগের সমস্ত মুহাদ্দিস উনার নাম শুনলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত করতে বাধ্য হন। মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর আনুষ্ঠানিকতার শরয়ী ফয়সালা সম্পর্কে উনাকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। উত্তরে তিনি যে কথা বলেছিলেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণÑ ‘ওলীমার আয়োজন করা এবং মানুষদেরকে আহার করানো সর্বাবস্থায়ই যখন মোস্তাহাব, তখন মর্যাদাপূর্ণ এই রবিউল আওয়াল মাসে নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নবুয়্যতের নূর প্রকাশিত হওয়ার আনন্দের সাথে উপরোক্ত বিষয়গুলো সংযোজিত হলেতো আর এর বৈধতা ও বরকতময়তার ব্যাপারে প্রশ্নই থাকেনা। সলফে সালেহীন থেকে এ মতামতের বিপরীত কোন কিছুই আমার জানা নেই। (রুহুস সিয়ার)
সম্মানিত পাঠক! মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুষ্ঠানকে যারা এ যুগের আবিস্কার বলে অপপ্রচার চালায় ইমাম আবু জুরআ রাজী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি এর কাছ থেকে তাদের নতুন করে সবক নেওয়া উচিত। তিনি দু’এক শতাব্দী আগের ইমাম নন বরং সেই হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর জগদ্বিখ্যাত হাদীস বিশারদ। তিনি বিশেষ কাঠামোয় ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুষ্ঠানকে বৈধ বলে ফতোয়া দিয়ে গেছেন।
সুতরাং মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদ্যাপনের কাঠামোগুলো হল, ১. নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর আগমনের ঘটনাবলী ও শান-মান আলোচনা করা। ২. সম্মেলন তথা জশ্নে জুলূছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম Ñএর আয়োজন করা। ৩. কুরআন তেলাওয়াত, না'তে রাসুল ও গজল আবৃত্তি করা। ৪. বেশী বেশী নেক আমল করা। ৫. মানুষদেরকে পানাহার করানো তথা তাবাররুক পরিবেশন ও দান-সদকা করা। ৬. দরূদ শরীফ পাঠ করা। ৭. আলোকসজ্জা করা। ৮. সুগন্ধি ব্যবহার করা। ৯. আনন্দ উদ্যাপন করা। ১০. উন্নত বস্ত্র পরিধান করা ইত্যাদি।
প্রিয় পাঠক, নিম্নের কথাগুলো অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করুন। তাহলে দেখতে পাবেন, সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে প্রত্যেক যুগেই ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচীতে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদ্যাপিত হয়ে আসছে।

ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর অর্ন্তনিহিত তত্ত্ব ঃ
উপরে দশটি বাস্তব কর্মসূচীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সম্ভাব্য অন্যান্য বৈধ কর্মসূচীর মাধ্যমেও ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদ্যাপন করা যায়। তবে এ সকল কর্মসূচী ও আনুষ্ঠানিকতার নিগুঢ়তত্ত্ব একটাইÑ আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে শুভাগমন করা আল্লাহর অপার অনুগ্রহ, নিয়ামত ও রহমত।
যেমন, ইবনে হাজর আসকালানী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
واى نعمة اعظم من النعمة ببروز هذا النبى نبى الرحمة فى ذالك اليوم
অর্থঃ রহমতের এ নবী আমাদের মাঝে শুভাগমন করেছেনÑ এর চেয়ে বড় নিয়ামত আর কি হতে পারে। আল হাভী লিল ফতওয়া, কৃত: আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতী (রহ:)।
আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
ان بعث الرسول ليس بواجب عليه سبجانه الا بموجب وعده وفضله وكرمه على عباده-
অর্থঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্রেরণ করা আল্লাহর উপর আবশ্যক নয়। শুধুমাত্র বান্দার উপর অনুগ্রহ ও দয়ার পরশ হয়ে এবং প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অনুসারেই তাঁকে প্রেরণ করেছেন। আল মাওরেদুর রাভী, কৃত: আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী।
আল্লামা আবু শায়েখ রহমাতুসাল্লামহি আলাইহি বলেন :
عن ابن عباس رضي الله عنهما ان الفضل العلم والرحمة محمد صلى الله تعالى عليه وسلم (روح المعانى)
অর্থ: হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহুতা’য়ালা আনহু হতে বর্ণিত, ফজল হল ইলম, আর রহমত হল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম । (রুহুল মায়ানী ১০/১৪১)
সুতরাং প্রমাণিত হলো, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর শুভাগমন আমাদের জন্য আল্লাহর রহমত, দয়া-করুণা ও অফুরন্ত নিয়ামত স্বরূপ। এ নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করাই ঈদ-এ মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম Ñএর নিগুঢ় তত্ত্ব ও রহস্য।
ইমাম সুয়ূতী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহিÑএর ভাষায় শুনুন,
فيستحب لنا اظهار الشكر بمولده عليه الصلاة والسلام-
অর্থঃ যেহেতু প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর শুভাগমন আমাদের জন্য রহমত, সেহেতু তাঁর শুভাগমনের শুকরিয়া আদায় করা আমাদের জন্য মোস্তাহাব। আল হাভী লিল ফতওয়া, কৃত: আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতী (রহ:)।
ইবনে হাজর আসকালানী রাহ্মাতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
ما يفهم منه الشكر لله تعالى
অর্থঃ যে সমস্ত কর্মসূচীর মাধ্যমে আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করা যায় তা দিয়েই মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন করা চাই। আল হাভী লিল ফতওয়া, কৃত: আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতী (রহ:)।